জাতীয় নির্বাচনে বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের ভূমিকা: সচেতনতা থেকে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কারিগর

লেখক: আসিফুল হক, নির্বাহী পরিচালক চেতনা, পরিবেশ ও মানব উন্নয়ন সংস্থা

১. গণতন্ত্রের উৎসবে নীরব অংশীদার

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা ব্যালট পেপারে সিল মারার আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি রাষ্ট্রের মালিক হিসেবে জনগণের ক্ষমতা প্রদর্শনের সর্বোচ্চ মুহূর্ত এবং রাষ্ট্রীয় পরিবর্তনের প্রধানতম উৎসব। আব্রাহাম লিংকনের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য’—বাস্তবায়নের মূল চাবিকাঠি হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বিষয় আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই বদ্বীপ রাষ্ট্রে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটির ওপরে। ভৌগোলিক জটিলতা, বিপুল জনসংখ্যা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভিন্নতার কারণে এখানে সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) একার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ।

এই বিশাল কর্মযজ্ঞে সরকারের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি যে শক্তিটি কয়েক দশক ধরে একটি নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে, তা হলো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এনজিওগুলোর যেমন ঐতিহাসিক ভূমিকা রয়েছে, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করতেও তাদের অবদান অনস্বীকার্য। দেশের প্রান্তিক পর্যায় থেকে শুরু করে দুর্গম চরাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত এনজিওগুলোর নেটওয়ার্ক এবং তাদের কর্মী নির্বাচনের প্রতিটি ধাপে যে ভূমিকা রাখছেন, তা আজ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

তৃণমূলের সেতুবন্ধন: ভোটার ও নির্বাচন কমিশনের মধ্যে সংযোগ—

বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় নির্বাচন কমিশন ঢাকায় বসে নীতিমালা প্রণয়ন করে, কিন্তু সেই নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন নির্ভর করে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার ওপর। এখানেই এনজিওগুলো সবচেয়ে বড় ‘সেতুবন্ধন’ হিসেবে কাজ করে। সরকারি কর্মকর্তারা অনেক সময় দাপ্তরিক সীমাবদ্ধতার কারণে সাধারণ মানুষের ঘরের ভেতর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেন না। কিন্তু এনজিও কর্মীরা যেহেতু সারা বছর স্বাস্থ্য, শিক্ষা, ঋণ কার্যক্রম বা কৃষি উন্নয়নে মানুষের দোরগোড়ায় যান, তাই স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাদের একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি হয়। এই বিশ্বাসযোগ্যতাকে পুঁজি করে তারা নির্বাচনের বার্তা খুব সহজেই মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন।

ভোটার সচেতনতা ও নাগরিক শিক্ষা: গণতন্ত্রের ভিত্তিস্থাপন—

নির্বাচনের মূল ভিত্তি হলো সচেতন ভোটার। একজন ভোটার যদি না জানেন, কেন তাঁকে ভোট দিতে হবে, তার ভোটের মূল্য কতটুকু বা তিনি কীভাবে সঠিক প্রার্থী বাছাই করবেন—তবে সেই নির্বাচন অর্থবহ হয় না। এখানেই এনজিওগুলো ‘ভোটার এডুকেশন’ বা ভোটার শিক্ষার মাধ্যমে একটি বিশাল দায়িত্ব পালন করে।

১.

গ্রামাঞ্চলে সচেতনতা বৃদ্ধি: দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের, বিশেষ করে শিক্ষার আলো থেকে কিছুটা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে ভোটাধিকার বিষয়টি অনেক সময় পরিষ্কার থাকে না। এনজিওকর্মীরা উঠান বৈঠক, পথনাটক, জারি-সারি গান এবং তথ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে অত্যন্ত সহজ ভাষায় ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তারা বোঝান যে, ভোট বিক্রি করার বিষয় নয়, এটি নাগরিক অধিকার।

২.

নারী ভোটারদের ক্ষমতায়ন: বাংলাদেশের নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ এখন দৃশ্যমান। এর পেছনে বেসরকারি সংস্থাগুলোর দীর্ঘদিনের পরিশ্রম রয়েছে। রক্ষণশীল সমাজ ব্যবস্থায় নারীদের ঘর থেকে বের করে ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা একসময় বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এনজিও কর্মীরা নারীদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, তাদের জীবনমান উন্নয়নে সঠিক প্রতিনিধি নির্বাচনের বিকল্প নেই।

৩.

নতুন ভোটারদের উদ্বুদ্ধকরণ: প্রতি নির্বাচনেই লাখ লাখ তরুণ প্রথমবারের মতো ভোটার হন। এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আগ্রহী করে তুলতে এবং তাদের সঠিক পদ্ধতিতে ভোটদানে (যেমন: ইভিএম ব্যবহার বা ব্যালট পেপার ভাঁজ করার নিয়ম) প্রশিক্ষিত করতে এনজিওগুলো কর্মশালা ও সেমিনারের আয়োজন করে।

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণে পর্যবেক্ষণ—

একটি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার স্বচ্ছতার ওপর। নির্বাচনে কোনো কারচুপি হচ্ছে কি না, ভোটাররা ভয়ভীতিহীন পরিবেশে ভোট দিতে পারছেন কি না—এসব নিশ্চিত করতে ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষণ’ একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত পদ্ধতি। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি গড়ে তোলার পেছনে এনজিওদের ভূমিকা অগ্রগণ্য।
কয়েক দশক ধরে দেশি-বিদেশি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে গঠিত ফোরামগুলো, যেমন ‘ইলেকশন ওয়ার্কিং গ্রুপ’ (EWG), নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অত্যন্ত পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করছে। নির্বাচনের দিন হাজার হাজার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এনজিও কর্মী পর্যবেক্ষক হিসেবে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন। তাদের কাজ পুলিশের মতো আইন প্রয়োগ করা নয়, বরং চোখের সামনে ঘটা ঘটনাগুলো লিপিবদ্ধ করা।

এই পর্যবেক্ষকরা দেখেন:

• ভোট গ্রহণ সঠিক সময়ে শুরু ও শেষ হচ্ছে কি না।
• প্রিসাইডিং কর্মকর্তা ও পোলিং এজেন্টরা নিরপেক্ষ আচরণ করছেন কি না।
• ভোটাররা গোপনে ভোট দিতে পারছেন কি না।

নির্বাচন শেষে তাদের দেওয়া নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন বা রিপোর্ট জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা বিচারের অন্যতম মাপকাঠি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি পরোক্ষভাবে নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর একটি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করে, যা তাদের স্বচ্ছ থাকতে বাধ্য করে।

অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন: কেউ যেন পিছিয়ে না থাকে

‘সবার জন্য নির্বাচন’—এই স্লোগান বাস্তবায়নে এনজিও কর্মীদের ভূমিকা মানবিক এবং প্রশংসনীয়। রাষ্ট্র অনেক সময় সাধারণ নিয়মে চলে, কিন্তু সমাজের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষদের জন্য প্রয়োজন বাড়তি যত্ন।

• প্রতিবন্ধী ও বয়স্ক নাগরিক: শারীরিক প্রতিবন্ধী, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং বয়স্ক নাগরিকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসা, তাদের জন্য লাইনে দাঁড়ানোর বিশেষ ব্যবস্থা করা এবং প্রয়োজনে ভোটদানে সহায়তার নিয়মাবলি সম্পর্কে তাদের পরিবারকে সচেতন করার কাজটি এনজিও কর্মীরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে করে থাকেন।

• সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী: ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু, বেদে সম্প্রদায়, হিজড়া জনগোষ্ঠী বা চা শ্রমিকদের মতো প্রান্তিক মানুষরা অনেক সময় ভয়ে বা সংকোচে ভোট দিতে চান না। এনজিওগুলো তাদের সাহস জোগায় এবং আশ্বস্ত করে যে, ভোট দেওয়া তাদের সাংবিধানিক অধিকার এবং রাষ্ট্র তাদের নিরাপত্তা দিতে বাধ্য। এই অন্তর্ভুক্তিমূলক কার্যক্রম ছাড়া কোনো নির্বাচনই সর্বজনীন হতে পারে না।

সরকারের সহযোগী শক্তি হিসেবে এনজিও

অনেকে মনে করেন বেসরকারি সংস্থা এবং সরকার বুঝি প্রতিপক্ষ। কিন্তু নির্বাচনের ক্ষেত্রে এনজিওগুলো মূলত সরকারের সহযোগী বা পরিপূরক শক্তি হিসেবে কাজ করে। নির্বাচন কমিশন যখন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করে, তখন এনজিও কর্মীরা মাঠপর্যায়ে তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে সহায়তা করেন। ভুয়া ভোটার চিহ্নিতকরণ থেকে শুরু করে মৃত ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া—এসব কারিগরি কাজে এনজিওদের তৃণমূলের তথ্য ভাণ্ডার অত্যন্ত কার্যকর। এ ছাড়া নির্বাচনের আচরণবিধি মেনে চলার জন্য প্রার্থীদের উৎসাহিত করা এবং সংঘাত এড়াতে শান্তি সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে তারা ‘পিস অ্যাম্বাসেডর’ বা শান্তির দূত হিসেবে কাজ করেন।

চ্যালেঞ্জ, নিরপেক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ করণীয়—

বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মধ্যেও কিছু চ্যালেঞ্জ ও সতর্কবার্তা রয়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাদের গ্রহণযোগ্যতা। কিন্তু নির্বাচনের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে যদি কোনো এনজিও কর্মী কোনো নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেন বা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেন, তবে পুরো প্রক্রিয়াটি প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

তাই, স্বচ্ছ নির্বাচনের স্বার্থে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি:

১. কঠোর আচরণবিধি: এনজিও কর্মীদের জন্য কঠোর আচরণবিধি (Code of Conduct) প্রণয়ন করতে হবে। নির্বাচনী দায়িত্বে থাকাকালে তারা কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচার করতে পারবেন না।

২. নিরপেক্ষতা বজায় রাখা: প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায় থেকে তৃণমূল কর্মী পর্যন্ত সবাইকে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে, তারা কোনো দলের কর্মী নন, তারা গণতন্ত্রের কর্মী।

৩. সমন্বয় ও তদারকি: নির্বাচন কমিশন এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে এনজিওগুলোর কাজের সমন্বয় থাকতে হবে। এনজিও ব্যুরো এবং নির্বাচন কমিশনের যৌথ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে যেন কেউ এনজিওর সাইনবোর্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে না পারে।

বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। নানা চড়াই-উতরাই পার করে নির্বাচন ব্যবস্থা আজকের পর্যায়ে এসেছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় এনজিওগুলো সরকারের বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। স্বচ্ছ ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোটারদের সচেতন করা, ভোটের দিন পর্যবেক্ষণ এবং ফলাফল পরবর্তী বিশ্লেষণ—প্রতিটি স্তরে এনজিও কর্মীদের নিষ্ঠা ও ঘাম জড়িয়ে আছে।

আগামী দিনের নির্বাচনগুলোকে আরও বেশি অংশগ্রহণমূলক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং স্বচ্ছ করতে হলে এনজিওগুলোর অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে। রাষ্ট্র যদি তাদের যথাযথ স্বীকৃতি দেয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা নিশ্চিত করে, তবে এনজিও কর্মীরা হতে পারেন বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। দিন শেষে, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং এটি একটি জাতির আত্মমর্যাদা এবং বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর ভিত্তি। আর সেই ভিত্তি মজবুত করার কারিগর হিসেবে এনজিও কর্মীদের ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

Source: https://nagorik.prothomalo.com/reader/ukbu9cff34

CATEGORIES:

Newspaper

Tags:

No responses yet

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest Comments

No comments to show.